মহাবিদ্রোহের ফলাফল সংক্ষেপে আলোচনা করো।
মহাবিদ্রোহের ফলাফল সংক্ষেপে আলোচনা করো।
ভূমিকা: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও নিষ্ফল ছিল না। মহাবিদ্রোহের আপাত উদ্দেশ্য অপূর্ণ থেকে গেলেও ভারতের ইতিহাসে এই মহাবিদ্রোহকে দিকচিহ্ন বলা অপ্রাসঙ্গিক নয়। বিদ্রোহের ঝড় থেকে ব্রিটিশ শাসন আপাতত রক্ষা পেলেও ভারতে ব্রিটিশ শাসনের নতুন ভিত্তি গঠনের প্রয়ােজন দেখা দেয়। এই জন্যই স্যার লেপেল গ্রিফিন মন্তব্য করেছেন “মহাবিদ্রোহ ভারতের আকাশ থেকে বহু মেঘ দূরে সরিয়ে দেয়।
মহাবিদ্রোহের ফলাফলগুলিকে আলােচনার সুবিধার জন্য তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘকালীন এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়। তাৎক্ষণিক ফলাফল ছিল মূলত শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন।
1. কোম্পানির শাসনের অবসান : ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ২রা আগস্ট ভারত-শাসন আইনের মাধ্যমে ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবলুপ্তি ঘটে এবং ভারত শাসনের দায়িত্ব প্রত্যক্ষভাবে ব্রিটিশ সরকারের হাতে ন্যস্ত করা হয়। এই প্রসঙ্গে উল্লেখযােগ্য যে, ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দের রেগুলেটিং আইন ও পরবর্তী বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে কোম্পানির ক্ষমতা পর্যায়ক্রমে খর্ব করা হয়। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পরিণতি হল ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইন।
2. শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন : মহাবিদ্রোহের পর ভারতীয় রাষ্ট্র পরিচালনায় নীতিগত পরিবর্তন ঘটে। ভারত-শাসন আইনের মাধ্যমে ঘােষণা করা হয় যে, ভারত-শাসনের সার্বিক দায়দায়িত্ব ভারত-সচিবএর হাতে অর্পিত হল। ব্রিটিশ মন্ত্রীসভার একজন সদস্য ভারত সচিবের পদ গ্রহণ করবেন। তিনি তার কাজকর্মের জন্য ব্রিটিশ মন্ত্রীসভা ও ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কাছে দায়ী থাকবেন এবং ব্রিটিশ মন্ত্রীসভার নির্দেশ অনুসারে তিনি কাজ করবেন। অন্যদিকে ভারত সচিব পনেরাে জন সদস্যবিশিষ্ট একটি কাউন্সিলের সহযােগিতায় শাসনকার্য নির্বাহ করবেন। অবশ্য সামরিক ব্যাপারে ভারত সচিব কাউন্সিলের কাছে সমস্ত তথ্য পেশ করতে বাধ্য থাকবেন না।
এছাড়া মহাবিদ্রোহের পর ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসন ব্যবস্থাকে মজবুত করার জন্য উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী নিয়ােগের ব্যাপারে প্রতিযােগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে আই. সি. এস. বা ভারতীয় সিভিল সার্ভিস ব্যবস্থার প্রণয়ন করা হয়, কিন্তু আই. সি. এস. পরীক্ষার পরীক্ষার্থীদের বয়সের সীমা এত কম করা হয় যাতে খুব কম ভারতীয় এই চাকুরিতে যােগ দিতে পারে।
3. মহারানির ঘােষণাপত্র : ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১লা নভেম্বরে এলাহাবাদে এক দরবারে আনুষ্ঠানিকভাবে মহারানির ঘােষণাপত্র প্রকাশ করা হল। এই ঘােষণাপত্রে ভারতবাসীর আনুগত্য অর্জনের জন্য কয়েকটি আশ্বাসবাণীও উচ্চারিত হয়, যেমন :
1. স্বত্ববিলােপ নীতি বাতিল করা হবে।
2. ব্রিটিশ সরকার ভারতে রাজ্যবিস্তার নীতিতে ছেদ টানবেন।
3. জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত যােগ্যতাসম্পন্ন ভারতীয় সরকারি চাকুরিতে নিয়ােগের সুবিধা পাবে।
4. দেশীয় রাজ্যগুলির সঙ্গে ইতিপূর্বে সম্পাদিত চুক্তিগুলি বহাল থাকবে।
5. ভারতের চিরায়ত রীতিনীতি, ধর্ম ও সামাজিক বিষয়ে সরকার অহেতুক হস্তক্ষেপ করবেন না।
4. অর্থনৈতিক পরিবর্তন : মহাবিদ্রোহের পর কেন্দ্রীয় সরকার থেকে প্রাদেশিক সরকারগুলােকে নির্দিষ্ট হারে অর্থ বরাদ্দ করার রীতি ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তার পরিবর্তে প্রাদেশিক ভূমিরাজস্ব ও অন্যান্য কর থেকে অর্থ সংগ্রহ করার দায়িত্ব প্রাদেশিক সরকারকে দেওয়া হয়। ফলে কেন্দ্রের ওপর প্রাদেশিক সরকারের নির্ভরতা অনেকটা কমে যায় এবং সেই সঙ্গে প্রাদেশিক প্রশাসন চাঙ্গা হয়ে ওঠার সুযােগ পায়।
5. সামরিক পুনর্গঠন : মহাবিদ্রোহের তিক্ত অভিজ্ঞতার আলােকে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সাম্রাজ্যবাদী বিভেদ নীতি (Devide & Rule Policy) প্রয়ােগ করে সামরিক বিভাগকে ঢেলে সাজানাে হয়। ভারতীয় সেনারা যাতে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে আবার বিদ্রোহ না করতে পারে তার জন্য নীচের ব্যবস্থাগুলাে নেওয়া হয় :
1.সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ অফিসার পদগুলি শ্বেতাঙ্গদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়।
2. সৈন্যদলে যাতে সহমত ও সহভ্রাতৃত্ববােধ গড়ে উঠতে না পারে সে জন্য মিশ্র সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে রেজিমেন্টগুলি বিন্যস্ত করা হল।
3. ভারতীয় সেনাদলে রাজপুত, ছত্রি ও উত্তর ভারতীয় ব্রাত্মণদের সংখ্যা কমিয়ে গুর্খা, পঞ্জাবি, পাঠান ও
শিখদের আনুপাতিক সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়।
4. সেনাবাহিনীতে বেঙ্গল রেজিমেন্টকে একেবারে দুর্বল করে ফেলা হয়।
6. মূল্যায়ন : সিপাহি বিদ্রোহের পর ভারতের প্রশাসন, সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন সংস্কার ও পরিবর্তনের পিছনে ব্রিটিশ সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতে ভারতে যাতে সিপাহি বিদ্রোহের মতাে পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয় তার ব্যবস্থা করা এবং ভারতের সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ প্রশাসনকে দৃঢ়ভাবে স্থাপন করা। এই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার কয়েকটি জনবিরােধী এবং প্রতিক্রিয়াশীল নীতি অনুসরণ করে, যেমন :
1. সিপাহি বিদ্রোহের সময়ে গড়ে ওঠা হিন্দু-মুসলমান ঐক্যকে ভেঙে দেওয়ার জন্য সরকারিভাবে প্রচেষ্টা শুরু হয়।
2. দেশীয় রাজা ও জমিদারদের নানান রকম সরকারি খেতাব দান করে সরকারের অনুগত রাখার চেষ্টা করা হয়।
এইভাবে সিপাহি বিদ্রোহের পরবর্তীকালে ভারতীয়দের মধ্যে বিভেদ নীতির প্রচার করে, ভারতীয়দের প্রতি নানারকমের প্রতিক্রিয়াশীল নীতি অনুসরণ করে। ভারতে সামাজিক ও শিক্ষাগত সংস্কার থেকে হাত গুটিয়ে নিয়ে ভারতীয় সমাজের ঐক্য ও অগ্রগতিকে ব্যাহত করার চেষ্টা করা হয়। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার মহারানির শাসনকালকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অধ্যায় বলে বর্ণনা করেছেন। সামগ্রিকভাবে ১৮৫৮ সালের ক্ষমতার হস্তান্তর ছিল একটি হাস্যকর পদক্ষেপ।
আরো পড়ুন- 1. মহাবিদ্রোহের কারণ গুলি কি কি?