সামন্ততন্ত্র কাকে বলে? সামন্ততন্ত্র বিষয়ে প্রশ্ন উত্তর

সামন্ততন্ত্র বিষয়ে প্রশ্ন উত্তর

1. সামন্ততন্ত্র কাকে বলে ?
উত্তরঃ সামন্ততন্ত্র বা ফিউডালিজম (Feudalism) হল জমির বিশেষ মালিকানার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা।
2. সামন্ত প্রথা কাকে বলে?
উত্তরঃ মধ্যযুগে ইউরােপে জমির রায়তি স্বত্বের মাধ্যমে যে বিশেষ ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক নিয়মতন্ত্রের সৃষ্টি হয় তাকে বলে সামন্ত প্রথা।
3. সামন্ত আদালতে প্রধান বিচারক কে ছিলেন?
উত্তরঃ সামন্ত আদালতে প্রধান বিচারক ছিলেন জমিদার।
4. প্রধান সামন্তের বিচার কোথায় হত?
উত্তরঃ প্রধান সামন্তের বিচার হত রাজার আদালতে।
5. সামন্ত প্রথায় পেজ বলতে কী বুঝায়?
উত্তরঃ সামন্ত প্রভুদের প্রধান কাজ ছিল যুদ্ধ করা। তাই ছােটোবেলা থেকে তাদের আয়ত্ত করতে হত সাহস। শিখতে হত লড়াইয়ের কলাকৌশল। তিনটি পর্যায়ে এই শিক্ষালাভ হত। বালক বয়সে সামন্ত প্রভুর সঙ্গে দুর্গে থেকে সে প্রতিদিনের পালনীয় নিয়মাবলি ও ভদ্র আচার-ব্যবহার শিখত। তখন তাকে বলা হত পেজ (Page)।
6. সামন্ততন্ত্রে রাজার ক্ষমতা কীভাবে নষ্ট হয় ?
উত্তরঃ বর্বর জার্মান জাতিদের আক্রমণে রােম সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে। রাজশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন জনগণ নিজেদের জীবন ও ভূ-সম্পত্তি রক্ষার জন্য রাজার কাছে আত্মসমর্পণ না করে বড়াে বড়াে ভূ-স্বামী ও আঞ্চলিক প্রভুদের আশ্রয়ে চলে যায়। এর ফলে রাজার ক্ষমতা ম্লান হয়ে আসে। দেশরক্ষা ও প্রশাসনের ক্ষমতা রাজার অধস্তন বড়াে বড়াে আঞ্চলিক প্রভুদের হস্তগত হয়। ফলে রাজার ক্ষমতা বিনষ্ট হয়।
7. সামন্ততন্ত্রের নানান স্তরের নামগুলি কী কী?
উত্তরঃ সামন্ততন্ত্রে রাজা ছিলেন সর্বোচ্চ প্রভু। তার নীচে প্রধান সামন্ত, তার নীচে মাঝারি সামন্ত, তার নীচে ছােটো সামন্ত, সবশেষে সার্ফ বা ভূমি-দাস
8. সার্ফ কাদের বলা হত?
উত্তরঃ স্বাধীনতাহীন ভূমি-দাস কৃষকদের সার্ফ বলা হত।
9. সামন্তযুগে দুর্গ তৈরি করতে হত কেন?
উত্তরঃ সামন্তযুগ ছিল যুদ্ধবিগ্রহের যুগ। এজন্য সামন্ত প্রভুরা নিজেদের ধনসম্পদ ও আত্মরক্ষার জন্য সুরক্ষিত দুর্গে বাস করতেন। পাহাড়ের উপর কোনাে উঁচু জায়গায় দুর্গ তৈরি করা হত। সমতলভূমিতে দুর্গ তৈরি হলে তার চারপাশে পরিখা খনন করা হত। পরিখা ঘেরা দুর্গে থাকত একটি বা দুটি সেতু। দুর্গের ভিতরে থাকত সেনাবাহিনী। তারা দুর্গের ভিতরে থেকে আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করত।
10. ইউরােপে সামন্ততন্ত্রের কীভাবে সূচনা হয়?
উত্তরঃ বর্বর জার্মান জাতির আক্রমণে রােম সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে। শহরের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে যায়। ধনী অভিজাতদের অনেকেরই গ্রামে জমিদারি ছিল। তারা তখন শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যায়। সেখানে তাদের ঘিরে থাকত কিছু কৃষিজীবী, কয়েকটি অনুগত পরিবার এবং অস্ত্রধারী কিছু পাহারাদার। যুদ্ধবিগ্রহের ফলে পথগুলি নষ্ট হয়ে যায়। অর্থাভাবে সেগুলি আর মেরামত হয়নি। পথে চোর-ডাকাতের উপদ্রব বাড়ে, ব্যাবসা-বাণিজ্যের দারুণ ক্ষতি হয়। দুর্বল রাজশক্তি জীবন, সম্পত্তি এবং শিল্পবাণিজ্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। তাই গ্রামগুলিকে বাধ্য হয়ে স্বনির্ভর হতে হয়। স্ব-পর্যাপ্ত এবং স্বনির্ভর গ্রামাঞ্চলগুলিতে অভিজাত ভূ-স্বামী সামন্তরা পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। তারা তাদের এলাকায় যেন ছােটো এক রাজা হয়ে বসল। তার এলাকায় জমি চাষ করে অনুগত প্রজারা। তাদের মধ্যে সে তার জমি নানা শর্তে বিলি করত। তারা হল ভূমি- দাস। সামন্তরা তাদের দায়িত্ব নেয়। এভাবেই সামন্ততন্ত্রের সূচনা হয়।

11. সামন্ততন্ত্রের মূল আদর্শ কী কী? একে সুষ্ঠু জীবনপদ্ধতি বলা যায় না কেন?
উত্তরঃ সামন্ততন্ত্রের মূল আদর্শ ছিল পরস্পরের প্রয়ােজনে রাজা ও জমিদারদের মধ্যে একটা চুক্তি হল, যার মূল ভিত্তি হল জমির রায়তী স্বত্ব। চিরকাল জমির মালিকই হয় প্রকৃত শাসক। জমির ওপর মালিকানা এবং উত্তরাধিকার রাজনৈতিক প্রভাব- প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করে। জমির মালিকানা ও শাসনের অধিকার লাভ করায় সামন্ত প্রভুরা অবিলম্বে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা লাভ করে। রাজশক্তি তাদের ব্যক্তিগত দখলে আসে। সামন্তরা নিজেদের জমি চাষ আবাদ করত না। একাজ করত তাদের নিয়ােজিত কৃষকরা। কৃষক বা চাষিরা ছিল সামন্তভিত্তিক সমাজের নীচের স্তরের মানুষ। এদের প্রভুর জমিতে বাধ্যতামূলক কাজ করতে হত। এদের ওপর চলত নিমর্ম শােষণ। দুঃখ-দুর্দশা আর নির্মম শােষণে জর্জরিত কৃষকশ্রেণি সামন্ত প্রভুদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘােষণা করে। তাই সামন্ততন্ত্রকে সুষ্ঠু জীবন পদ্ধতি বলা চলে না!

12. সামন্তযুগে কৃষক ও সার্ফদের জীবনধারা বর্ণনা করাে অথবা তাদের জীবনের তুলনা করাে।
উত্তরঃ সামন্তযুগে কৃষকদের সম্পত্তির মধ্যে ছিল খড়ের ছাউনি দেওয়া একটা ছােটো কুঁড়ে ঘর আর একখণ্ড জমি। এই ঘরে তারা অন্যের থেকে পৃথক হয়ে নিজেদের পরিবার নিয়ে বাস করত। আর নিজেদের জমিতে মেহনত করে ফসল ফলাত। বছরে দশমাস তাদের খাটতে হত। তাদের খাদ্য ছিল সাধারণ মােটা রুটি আর শাকসবজি। মুক্ত কৃষক ও সার্ফ উভয়কেই প্রভুর জমিতে বাধ্যতামূলকভাবে কাজ করতে হত। সাফদের স্ত্রী-পুত্র, কন্যা সকলকেই প্রভুর জমি, পশুপালন ও গাহথ্য কাজে শ্রম দিতে হত এবং নানারকম ভাবে তার ফরমাস খাটতে হত! এই সব জুলুম সহ্য করে কৃষকদের বেঁচে থাকতে হত।

13. সামন্ততন্ত্রে কৃষক বিদ্রোহ ঘটেছিল কেন? উহার ফলাফল কী হয়েছিল ?
উত্তরঃ সামন্ত যুগের শেষ দিকে সামন্ত প্রভুদের আয় কমতে থাকে। তখন কৃষকদের ওপর শােষণ বাড়তে থাকে। এই রকম শােষণ থেকে মুক্তি পারার জন্য কৃষকরা বিদ্রোহ করে। ফ্রান্সে, হল্যান্ডেও ইংল্যান্ডে কয়েকটি বিদ্রোহ ঘটে। কৃষকদের দাবি ছিল, কাউকে সার্ক করে রাখা যাবে না। সবাইকে স্বাধীনতা দিতে হবে ও অত্যাচারমূলক সব কর তুলে দিতে হবে। আবার বােহেমিয়াতে ইয়ান হাসের প্রেরণায় কৃষকরা বিদ্রোহ করেছিল।
কৃষক বিদ্রোহগুলি মূলত সামন্ত প্রভু, যাজক ও তাদের কর ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছিল। শােষিত মানুষের সম্মিলিতভাবে বিদ্রোহ সামন্ত যুগের শেষ পর্বের সবচেয়ে বড়াে ঘটনা। এইসব বিদ্রোহ দমন করা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এর ফলও হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। সামন্ত প্রভুদের অত্যাচারও, যেমন কমেছিল, সেই রকম কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের মজুরিও কমে গিয়েছিল। এই বিদ্রোহের ফলে এই সত্য প্রকট হয়ে উঠেছিল যে, কৃষকরা আর অবহেলার পাত্র নয় তাদের সঙ্ঘ-শক্তি সমাজের জগদ্দল পাথরকে নাড়িয়ে দিতে পারে। যাবতীয় কৃষক বিদ্রোহ সমাজের শােষক ও শােষিত শ্রেণির সম্পর্ককে নিশ্চিত পরিবর্তনের মুখে দাঁড় করিয়েছিল। এই পরিবর্তনের ইশারা নিয়ে সামন্তযুগ শেষ হয়।

Next Post Previous Post
2 Comments
  • Unknown
    Unknown February 28, 2022 at 9:49 PM

    Nice

    • Anonymous
      Anonymous November 4, 2022 at 10:15 PM

      Nice

Add Comment
comment url