মধ্যযুগের শিভ্যালরি বলতে কী বােঝাে ? এদের অবদান কী ছিল?
মধ্যযুগের বীরধর্ম বা শিভ্যালরি
উত্তরঃ সামন্তপ্রথার সঙ্গে শিভ্যালরি কথাটি অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। সামন্তপ্রথার সামরিক দিকটিকেই শিভ্যালরি বােঝায়। শিভ্যালরি একথাটি এসেছে ক্যাভলরি অর্থাৎ ঘােড়সওয়ার শব্দটি থেকে। রােমান সাম্রাজ্য পতনের পর যখন সামন্তপ্রথা প্রথম গড়ে উঠেছিল সামন্তরা তখন আত্মরক্ষার জন্য ঘােড়ার পিঠে চড়ে যুদ্ধ করত। জমির মালিকরাই কেবল সামন্ত হতে পারত। তাই প্রথম দিকে সামন্ত এবং উপ-সামন্তরাই বর্ম পরিধান করে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঘােড়ার পিঠে চড়ে যুদ্ধ করত। সামন্ত বা জমিদার পরিবারের ছেলেরা যুদ্ধবিদ্যা ও বীরত্বকেই জীবনের ব্রত বলে মনে করত। তাদের বীরধর্ম এবং ভদ্রতা, সভ্যতা শেখবার জন্য তাদের সেবা করা ও আদেশ পালন করাই এদের কাজ ছিল। তার বিনিময়ে এরা আহার ও বাসস্থান পেত। সামন্ত-প্রভুর অধীনেই অশ্বারােহণ, অস্ত্রচালনা এসব শিখত। শিক্ষা সমাপ্তি হলে এবং শিক্ষার্থীর বয়স একুশ বছর হলে দীক্ষা দেওয়া হত। দীক্ষার সময় নতজানু হয়ে এদের শপথ গ্রহণ করতে হত যে, তারা জীবন পণ করে বিপন্ন ব্যক্তি, স্ত্রীলােক ও খ্রিস্টধর্ম রক্ষা করবে। সহযােগী নাইটদের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবার প্রতিশ্রুতি দিতে হত। শপথ গ্রহণ করবার পর তাদের নাম হত নাইট। নাইটদের কাজ ছিল বিপন্ন বা আর্তকে রক্ষা করা সামন্ত প্রভুর জন্য যুদ্ধ করা। এই বীরধর্মকে বলা হত শিভ্যালরি। অনেক সামন্ত পরিবারের জমিদারি নষ্ট হয়ে গেলে বা কোনাে কারণে জমিদারি শেষ হয়ে গেলে তাদের বংশধরেরা একেবারে গরিব হয়ে যেত। এদের একমাত্র সম্বল ছিল বংশগরিমা। এসব পরিবারের ছেলেরা নাইটদের যুদ্ধরীতি শিখে নিয়ে তাদের আচার - আচরণ জেনে নিজেরা ঘােড়সওয়ার যােদ্ধা বা নাইট হত। এজন্য অনেকদিন তাদের শিক্ষানবিশী করতে হত। এ ধরনের নাইটদের পোশাক -পরিচ্ছদ, অস্ত্রশস্ত্র সামন্ত নাইটদের মতােই ছিল। বড়াে বড়াে জমিদারের অধীনে এরা কাজ নিত। মুসলমানদের দখল থেকে জেরুজালেম, প্যালেস্টাইন ফিরিয়ে আনার জন্য যে ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ হয়েছিল, সে সময় বহু নতুন নাইটের সৃষ্টি হয়েছিল। সামন্তপ্রথার মধ্য থেকে কতকগুলাে আচরণ ও আদর্শ মেনে চলা ঘােড়সওয়ার শ্রেণির যে উদ্ভব হয়েছিল, একেও শিভ্যালরি বলা হয়।
ক্রুসেডের সঙ্গে শিভ্যালরি যুক্ত হয়ে তা এক সামরিক ও ধর্মীয় ঘােড়সওয়ার বাহিনী হয়ে দাঁড়াল। ভগবানের সেবা, বিধর্মীদের হাত থেকে খ্রিস্টধর্মকে রক্ষা করা চার্চকে রক্ষা করা—এসব ছিল এই নাইটদের প্রধান আদর্শ। সেসময় ইউরােপে যে অরাজকতা, অশান্তি বিরাজ করছিল, তা এই নাইটদের ভদ্র আচরণ, সমাজসেবার মনােভাব ইত্যাদির ফলে অনেকাংশে সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছিল। এদের নম্র ও ভদ্র আচরণ তখনকার যুবসমাজে প্রভাব ফেলেছিল। স্ত্রী-জাতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, স্ত্রীলােকের মর্যাদা রক্ষা, বিধবা, অসহায়, আর্ত লােকের রক্ষা করাই ছিল শিভ্যালরির কর্তব্য। আদর্শ চরিত্র গঠনে, ভদ্রতা, শালীনতা প্রভৃতির চারিত্রিক গুণাবলি সৃষ্টিতে শিভ্যালরির অবদান অনেক।
2. শিভ্যালরি আদর্শের মূল দিকগুলি কী ছিল?
উত্তর: শিভ্যালরি আদর্শের মূল দিকগুলি ছিল - নারীর প্রতি ভদ্র ব্যবহার ও তার মর্যাদা রক্ষা, প্রভুভক্তি, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, শিষ্টের পালন ও দুষ্টের দমন, অনাথ শিশুদের রক্ষা ইত্যাদি।
3. শিভ্যালরিদের শিক্ষা কীভাবে দেওয়া হত?
উত্তরঃ দুর্গাধিপতি সামন্ত প্রভু ও তার অনুচরদের মূল পেশা ছিল যুদ্ধ করা। তাদের যােগ্যতা ছিল বীরত্ব। যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা ছিল বাধ্যতামূলক। অল্প বয়স থেকেই এদের যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা দেওয়া হত। যুদ্ধবিদ্যা শিখতে হলে প্রতিপত্তিশালী কোনাে যােদ্ধার অনুচর হিসেবে থাকতে হত। তাদের আপাদমস্তকে ভারী লােহার বর্ম পরতে হত। ঢাল বহন করতে হত। বর্শা ও তরবারি চালানাে শিখতে হত। ঘােড়ায় চড়া অবশ্যই শিখতে হত। যুদ্ধবিদ্যা শেখার পরে তাদের নাইট বলে গণ্য করা হত। প্রভুর সামনে নতজানু হয়ে বসে নাইটদের প্রতিজ্ঞা করতে হত যে, তারা বর্ম ও নারীর সম্মান রক্ষা করবে, আর্তের সাহায্য করবে ও সহচর নাইটদের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে। এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে তাদের অস্ত্রশস্ত্র দেওয়া হত। প্রভুর প্রতি বিশ্বস্ত থাকা, দুর্বল ও বিপন্নকে সাহায্য করা এবং অদম্য সাহসের অধিকারী হওয়ার এই যে আদর্শ একেই বলা হয় শিভ্যালরি।
4. বীরধর্ম কী ?
উত্তরঃ নাইটরা যেসব কর্তব্যপালন ও আচরণ করতে বাধ্য থাকত তাকে একসময় বলা হত বীরধর্ম।